বুধবার, ০৮ Jul ২০২০, ০৪:১২ অপরাহ্ন

ঝিনাইগাতীতে অস্তিত্ব সংকটে বেদে সম্প্রদায়

ঝিনাইগাতীতে অস্তিত্ব সংকটে বেদে সম্প্রদায়

জয়িতা রায় : অস্তিত্ব হারাতে বসেছে ঝিনাইগাতী উপজেলার ডেফলাই গ্রামের বেদে সম্প্রদায়। এ গ্রামের বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের অভাব-অনটন, দুঃখ আর দুর্দশাই যেন নিত্যসঙ্গী। আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সনাতন পদ্ধতির কবিরাজি প্রথা ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ ও সিঙ্গা লাগানোর প্রথা টিকে থাকতে না পেরে আজ তারা দিশেহারা। অর্থের অভাবে না পারছে তারা অন্য পেশায় যেতে, না পারছে তাদের আদি পেশা টিকিয়ে রাখতে। এ বেদে পল্লীতে ৭০টি পরিবারের প্রায় ৭০০ লোকের বাস। ২০১০ সালে এ বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন ১/২ শতাংশ জমি ক্রয় করে বসতি স্থাপন করে বসবাস করে আসছে। এদের আদি আবাস ঢাকার সাভারে। এরা প্রথমে ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের পানবর ও গুরুচরণদুধনই গ্রামে বসতি স্থাপন করে আসছিল। কিন্তু সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থান বেহাল দশা, বন্যহাতি, চোরের উপদ্রবসহ এলাকাবাসীর অসহযোগীতার কারণে টিকে থাকতে পারেনি। সেখান থেকে তারা চলে এসে নলকুড়া ইউনিয়নের দক্ষিন ডেফলাই গ্রামে নতুন করে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে তাদের আদিপেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের অভাব অনটন দুঃখ আর দুর্দদশাই যেন নিত্য সঙ্গী। অতীতে তাদের এ পেশায় সচ্ছল ভাবে জীবন জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সমাজেও তাদের মূল্যায়ন ছিল। নৌক যোগে সারাদেশের নদ-নদীতে তাদের পদচারনা ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের নদ-নদী গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় আজ ডাঙ্গায় উঠতে হয়েছে তাদের। বর্তমানে ডিজিটাল যুগে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তাদের এই পেশা তারা আর ধরে রাখতে পারছে না। ঝাঁড়ফুক সিঙ্গা তাবিজের প্রতি মানুষের নেই আগের মত আস্থা। তবুও জীবিকার তাগিদে এ পেশা ধরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে তারা। সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে কথা বলে তাদের অবর্ণনীয় দুঃখ আর দুর্দশার কথা জানা গেছে। এ পল্লীর বেদে সরদার মোছন আলী বলেন, এখানে আমরা সবাই অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছি। এখানে আমাদের ৭০টি পরিবারের বসবাস। কেউ কেউ ১/২ শতাংশ জমি ক্রয় করলেও অর্থের অবাবে তারা ঘরবাড়ি তৈরী করতে পারছে না। অনেক পরিবার তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে দুবেলা পেট ভরে খেতে পারে না। তিনি আরও বলেন, এখানে স্থানীয় লোকজন তাদের সহযোগীতা করে, তবে সরকারী ভাবে কোন সাহায্য সহযোগীতা পায় না।

বেদে গিয়াস উদ্দিন, নুরুল আমীন, শেখ মিয়া, আবুল কাশেম ও শহিদুল ইসলাম বলেন, তাদের পল্লীতে যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা, নেই কোন রাস্তা। বেদে পল্লীর মাঝখান দিয়ে একটি ঝরনা এ পল্লীকে দুভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। এখানে রয়েছে একটি ব্রিজের অভাব। ব্রিজ না থাকায় বর্ষা মৌসুমে কোমলমতি ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করার জন্য নেই কোন স্কুল মাদ্রাসা। শিশু রুবিনা আক্তার (৭), সুমি আক্তার (৬), সায়লা আক্তার (৫), মরিয়ম খাতুন (৫), রাবিনা (৬), ঝরনা (৬), সীসলা (৬) ও রাশেদুল (৭) এর সাথে কথা হয়। তাদের পড়ালেখা করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা থাকলেও দারিদ্রের কারনে তাদের সে আশা হয়তো কোনদিন পূরণ হবে না। এ ধারনা পোষন করে ওই কোমলমতি শিশুরা। শিশুদের অনেকেই পুষ্টিহীনতার শিকার। শিশুরা জানায়, পাশের গ্রামে খ্রীষ্টান মিশনারী স্কুলে তাদের পড়তে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে কাদামাড়িয়ে কোমলমতি শিশুদের স্কুলে যেতে চরম র্দুভোগের শিকার হতে হয়।

এ বেদে পল্লীতে রয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব। এরা পায় না কোন সরকারী বেসরকারী সাহায্য সহযোগীতা। যেমন-ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সরকারী কোন অনুদান। শিক্ষা-দিক্ষায় রয়েছে তারা অনেক পিছিয়ে। শিক্ষার অভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে নেই কোন ধারনা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি পরিবারে ৫ থেকে ১২ জন পর্যন্ত রয়েছে সন্তানাদি। অভাবের অন্যতম এটি একটি কারণ। অর্থ সংকটের কারনে তারা অন্য কোন পেশা বেছে নিতে পারছে না। তাই জীবিকার প্রয়োজনে বছরের বেশি থাকতে হয় দেশের বিভিন্ন স্হানে। বাড়িতে থাকে বৃদ্ধ ও ছোটরা। পুরুষ বেদেরা বিভিন্ন গ্রাম ও বন জঙ্গলে সাপ ধরে ও হাট বাজারে খেলা দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করে। সাপে কাটা রোগীদের ঝাড়ফুঁক দেয়। পুকুর বা নদীতে স্বর্ণালঙ্কার হারিয়ে গেলে তা খুঁজে বের করে থাকে। এভাবে তারা অর্থ উপার্জন করে।

শিরিনা বেগম নামে এক বেদেনী বলেন, আগে মহিলা বেদেনীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কোমর বা হাঁটুতে সিঙ্গা লাগিয়ে বিষ-ব্যথা নিবারন এবং বিভিন্ন রোগের তাবিজ বিক্রি করে চাল ও অর্থ উপার্জন করত। কিন্তু এখন আগের মত আর উপার্জন হয় না। এখন তাদের প্রতিদিন গ্রাম ঘুরে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকে। তা দিয়ে কোন রকমে চলে তাদের সংসার। বর্তমানে তাদের দুঃখ কষ্টের যেন শেষ নেই। এ পল্লীর কেউ জানে না তাদের দুঃখের শেষ কোথায়।

Facebook Comments

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |
Design & Developed BY Icche LOta